দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একের পর এক অঘটনে বদলে গেছে শক্তির প্রচলিত সমীকরণ। প্যারাগুয়ের কাছে জার্মানির বিদায়, নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের হার কিংবা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মিসরের দুর্দান্ত লড়াই-সব মিলিয়ে স্পষ্ট, নামের জৌলুস নয়; মাঠের পারফরম্যান্সই এখন শেষ কথা। ছোট-বড় দলের ব্যবধান প্রায় মুছে যাওয়া এই বিশ্বকাপেই এবার শেষ আটের টিকিটের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ও আফ্রিকার উদীয়মান শক্তি মরক্কো।
এই ম্যাচটার পেছনে শুধু বর্তমানের রণকৌশল নয়, লুকিয়ে আছে মরোক্কানদের পুরোনো হিসাব চুকানোর তীব্র বাসনা। কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এই এমবাপ্পেদের কাছে হেরেই বিদায় নিয়েছিলেন আশরাফ হাকিমিরা। কাসাব্লাঙ্কা কিন্তু সেই রাতে সুফিয়ান বুফালের ওপর হওয়া পেনাল্টির জোরালো দাবি নাকচ হয়ে যাওয়ার কান্না আজও ভোলেনি। এর ওপর যোগ করা যায় দেশের শতাব্দী প্রাচীন ঔপনিবেশিক অতীতকে। ফলে ফ্রান্সের আভিজাত্যের সামনে মরক্কোর এই ‘প্রতিশোধের’ আগুন আজ ম্যাচটাকে এক অন্য বারুদে রূপান্তর করতে চলেছে। ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম খুব ভালো করেই জানেন, নকআউটের এই দাবার বোর্ডে কোনো ‘ওয়াকওভার’ পাওয়া যাবে না! মরক্কো কেবল এক রূপকথার দল নয়, তারা এক নিরেট ট্যাকটিক্যাল পাওয়ার- সেই অভেদ্য রক্ষণের সামনে আজ পরীক্ষা ফরাসিদের গতি আর মগজের। কিলিয়ান এমবাপ্পের একের পর এক গোলমুখী দৌড় বনাম মরক্কোর জান লড়িয়ে দেওয়া ট্যাকল। ‘বড়দের’ পতনের এই বাজারে ফ্রান্স কি পারবে নিজেদের রাজত্ব বাঁচাতে, নাকি মরক্কোর নতুন ইতিহাস লেখার সাক্ষী থাকবে ফুটবলবিশ্ব? বোস্টন অপেক্ষা করে আছে আজ বিশ্বকাপের আরেকটি হাইভোল্টেজ ম্যাচ উপহার দিতে।
আগের ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিষাক্ত সব ট্যাকেল থেকে মুক্তি পেতে এমবাপ্পেরা কিন্তু শেষ পর্যন্ত কুৎসিত ফুটবলকেই বেছে নিয়েছিলেন। এমবাপ্পের মুখে ‘কুৎসিত ফুটবলের’ সেই স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে, ফ্রান্স এবার আর রূপের ফুটবল খেলবে না, মরক্কোকে তাদেরই ওষুধে কুপোকাত করতে প্রয়োজনে ‘কদর্য’ হতেও প্রস্তুত সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। মরক্কোর বিপক্ষে নামার আগে ফ্রান্সের এই মানসিক ভোল বদলটাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কারণ, মরক্কো হলো এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ‘লকডাউন স্পেশালিস্ট’। ওরা প্রতিপক্ষকে সুন্দর ফুটবল খেলতেই দেয় না; নিখুঁত প্রেসিং, অনবদ্য ট্যাকল আর ফিজিক্যাল ফুটবল দিয়ে প্রতিপক্ষের পায়ে শিকল পরিয়ে দেওয়াটাই অ্যাটলাসের সিংহদের ব্রাজিলের মতো দলও মরক্কোর বিরুদ্ধে ওই নান্দনিক ফুটবলের অহংকার দেখাতে গিয়ে প্রথম ম্যাচেই ড্র করার অস্বস্তি মেনে নিয়েছিল। ফরাসি কোচ দেশম খুব ভালো করেই জানেন, মরক্কোর এই পাথুরে দেয়াল ভাঙতে গেলে শুধু প্যারিসিয়ান ঘরানার সুন্দর পাসিং ফুটবলে কাজ হবে না। সেখানে দরকার গায়ের জোর, দরকার ট্যাকটিক্যাল ফাউল আর প্রতিপক্ষের ডার্টি গেমের মুখে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করা।
তবে কোয়ার্টার ফাইনালের এই ম্যাচের আগে ড্রেসিংরুমে কান পাতলে একটা অদ্ভুত সুরও শোনা যাবে- সেটা হলো বন্ধুত্বের, প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের ছায়ায় গড়ে ওঠা নিবিড় সম্পর্কের। মরক্কোর এই দলের সবচেয়ে বড় সেনাপতি আশরাফ হাকিমি তো আসলে প্যারিসের ঘরের ছেলেই! পিএসজির জার্সিতে তাঁর ওই ডান দিকের চিতার মতো দৌড় কিংবা একসময় কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে একই ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়ার সেই রসায়ন ফুটবল রোমান্টিকদের বড্ড চেনা। কিন্তু আজ রাতে সেই রূপকথা আইস বক্সে বন্দি। যখন দেশের জার্সির প্রশ্ন আসে, তখন বন্ধুত্বকে মাঠের বাইরে রেখে বুটের ফিতে বাঁধতে হয়। প্যারিসের যে গ্যালারি হাকিমিকে দুহাত ভরে তালি দিয়েছে, আজ সেই প্যারিসের সাম্রাজ্য চূর্ণ করতেই ছক কষছেন এই মরোক্কান ডিফেন্ডার। এমবাপ্পের শক্তির জায়গা, দেম্বেলের ড্রিবলিংয়ের দুর্বলতা- সবই তো হাকিমির নখদর্পণে। নিজের প্রিয় ক্লাবের সতীর্থদের আটকাতে হাকিমি আজ কতটা ‘নিষ্ঠুর’ জাদুকর হয়ে উঠতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করছে মরক্কোর ভাগ্য। বন্ধুত্বের এই চোরাস্রোত আর মাঠের ভেতরের নিঃশব্দ মনস্তাত্ত্বিক লড়াই আজ ম্যাচটাকে এক পরম নাট্যমুহূর্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে!
মাঠের বাইরে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটা কিন্তু ইতিমধ্যেই জমে উঠেছে, যেখানে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম তাঁর চিরচেনা মাপা চাল আর ঠান্ডা মাথায় প্রতিপক্ষকে সমীহ করার ট্র্যাডিশন বজায় রেখেছেন। ‘মরক্কো বিশ্বের অন্যতম সেরা দল এবং ওরা কোনো দুর্ঘটনার সুযোগ নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেনি।’ তাঁর এই সমীহ আসলে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন ভয়। কারণ তিনি জানেন, বড় দলগুলোর পতনের বাজারে মরক্কো এখন এক জীবন্ত আতঙ্কের নাম।
কেএম